Thursday, January 8, 2009

মাঝে মাঝে খুব বেশি ভুল করে ফেলি


মাঝে মাঝে খুব বেশি ভুল করে ফেলি। অভিমানী পৃথিবীর
দিকে তাকিয়ে দেখি ক্ষয়িষ্ণু বোধের বিকেল, আমাকে গ্রাস
করতে এগিয়ে আসছে। যারা আমার সাথী ছিল , তারা সবাই
বেছে নিয়েছে অকাল অবকাশ। পেরিয়ে মধ্যবয়স তারা আর
কোনো নদীতেই কাটতে পারছে না সাঁতার।অথচ আমরা বার
বার ভাসবো- ডুববো , তারপর কৌশলী ডুবুরীর মতো ভিড়ে
যাবো রৌদ্র উপকূলে, এমন একটা প্রত্যয় ছিল খুব গোপনে।

সব গোপন , সকল সময় আর লুকানো থাকে না। রহিত রাত
এসে আলিংগন করলে একান্ত বিরহ ও হয়ে যায় মায়াবী বুনন।
বীজ আর বীক্ষণের শিয়রে বসে শুধু হাত নাড়ে ভুলের রুমাল।
সে ও ধারণ করে রেখেছে কিছুস্মৃতি,বৈশাখে আমাকে দেবে বলে।

মৌলবাদ যেভাবে সমকালকে ধ্বংস করে দেয়


মৌলবাদ যেভাবে সমকালকে ধ্বংস করে দেয়
ফকির ইলিয়াস
--------------------------------------
মৌলবাদ দমনে বিশ্বের নীতিনির্ধারকরা প্রকৃতপক্ষে আন্তরিক কি না তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কারণ, মৌলবাদ সব সময়ই সামন্তবাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। বিশেষ করে সমাজতান্ত্রিক বিশ্বকে ভেঙে খান খান করে দিতে পুঁজিবাদীরা এটাকে ব্যবহার করেছে। এমন কি গোত্রগত সংঘাত চাঙ্গা করে রাখতেও ব্যবহৃত হয়েছে মৌলবাদী দানতন্ত্র। তবে কি পরোক্ষভাবে গণতন্ত্রই মৌলবাদের সহচর? আসতে পারে সে প্রশ্নটিও।
দেখা গেছে, গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার নামে কোন কোন দেশে মৌলবাদকে উসকে দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে- এটাও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। পুঁজিবাদীরা একে ব্যবহার করেছে তাদের প্রয়োজনে। পরে দেখা গেছে এভাবেই ছড়িয়ে পড়েছে বিষবাষ্প। দূষিত হয়ে গিয়েছে ক্রমশ! গোটা বিশ্বের মুক্তিকামী গণতান্ত্রিক মানুষের নিঃশ্বাসের আবাসস্থল।
সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসেবে ইরাকের কথাই ধরা যাক। ইরাকের শাসক সাদ্দাম হোসেন স্বৈরাচারী ছিলেন। ইরাক শিয়া অধ্যুষিত দেশ। তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ। ভোট হলে শিয়ারা ক্ষমতায় থাকবে সারাজীবন। সুন্নী পন্থী সাদ্দাম হোসেন টুঁটি চেপে ধরে ছিলেন। ক্ষমতায় ছিলেন বলপূর্বক। এই সাদ্দাম একসময় ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের। সে সম্পর্কে ফাটল ধরার পরই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের শাসকদের কাছে চোখের বালিতে পরিণত হন।
সাদ্দামের দেশ ইরাকে গণবিধ্বংসী পরমাণু অস্ত্র আছে, এমন ধুয়া তুলে যুক্তরাষ্ট্র। তারপর যুদ্ধ বাধায়। সে যুদ্ধ এখনো চলছে। ইরাক এখন ধ্বংসস্তূপ। তারপরও পুঁজিবাদীর দৃষ্টি সেখানে প্রসারিত। নেপথ্য নিয়ন্ত্রণ রাখার মরিয়া প্রচেষ্টা চলছে। অন্যদিকে বিদ্রোহীরা মৌলবাদী লেবাসে হোক আর জঙ্গিবাদী লেবাসে হোক প্রতিদিন চোরাগোপ্তা হামলা করছে। শেষ সময়ে এসে আক্রান্ত হয়েছেন স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ। একজন সাংবাদিক বুশকে জুতো নিক্ষেপ করেছেন। তার নাম মুন্তাজার আল যাইদী। জাইদীর ক্ষোভ ছিল ভীষণ, তিনি স্বজন হারিয়েছেন এই যুদ্ধে। নিজে বন্দি থেকেছেন। ইরাক যুদ্ধে নিহত মানুষের লাশ জাইদীকে ব্যথিত করেছে। তিনি তার ঘৃণার চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। এমন ঘৃণা পুঁজিবাদী দুঃশাসন এবং মৌলবাদী হায়েনা দুটোকেই উসকে দেয়। বুশের মাথার ওপর দিয়ে একজোড়া জুতো উড়ে যাওয়ার পর বুশ সাংবাদিকদের হেসে কি বলেছেন- সেটা দেখুন। বুশ মসকারা করে বলেছেন- ‘ইট ওয়াজ এ সাইজ টেন’! অর্থাৎ জুতা জোড়া দশনম্বর ছিল। ভাবটা যেন এমন, চৌদ্দ নম্বর জুতা তার মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেলেও তার কিছু যায় আসে না! এর কারণ কি? কারণটি হচ্ছে সামন্তবাদ ধরে রাখতে হলে এমন ঘটনাবলী সহজে গ্রহণ করার মানসিকতা থাকতেই হয়! বুশ জানেন, ইরাক যুদ্ধে চার হাজার দুইশ’র বেশি মার্কিনী সৈন্য প্রাণ দিয়েছে। পরিসংখ্যানটি সরকারি। বেসরকারিভাবে এর সংখ্যা বেশি হতে পারে। আর কতজন ইরাকি প্রাণ দিয়েছে এর হিসাব শুধু মহাকালই জানে। ইরাকে বর্তমানে শিয়া-সুন্নির মাঝে যে গৃহযুদ্ধ চলছে এর শেষ কোথায় তা স্বয়ং বুশও জানেন না। তবে বুশ এ জন্যই সন্তুষ্ট, তিনি যুদ্ধটি বাধাতে পেরেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অব স্টেট মিস কন্ডোলিৎসা রাইস বলেছেন, ইরাকীরা যে তাদের মৌলিক স্বাধীনতা ফিরে পেয়েছে, এই ঘটনা তার প্রমাণ। কি আহাম্মকি মার্কা কথাবার্তা! ইরাকে কি তাহলে আগে মৌলিক স্বাধীনতা ছিল না? অবশ্যই ছিল, বরং শিয়া-সুন্নির মাঝে গোত্রগত স্থায়ী সংঘাতের জন্ম দিতে পেরে সে স্বাধীনতায় কেরোসিন ঢেলে দিয়েছে পুঁজিবাদীরা। দোহাই দিয়েছে মৌলবাদের। আর এ সুযোগে কাগুজে বাঘ বিন লাদেনের নামে জোশ পেয়ে মধ্যপ্রাচ্যে গড়ে উঠেছে অনেক আত্মঘাতী স্কোয়াড। এরা নানাভাবে তটস্থ রাখছে গোটা বিশ্বকে।
ধরা যাক আলজিরিয়ার কথা। সেখানেও গোত্রীয় সংঘাত বাঁচিয়ে রাখা হচ্ছে এই মৌলবাদী ঝা-াকে বাঁচাবার জন্য। উপমহাদেশে হিন্দু মৌলবাদ, মুসলিম মৌলবাদ- এই দুয়ের চরিত্রই আমরা জানি। মৌলবাদ এভাবেই ব্যবহৃত হচ্ছে জঙ্গি গ্রুপের হাতে, পুঁজিপতি শাসকদের হাতে, মুনাফাখোর বণিকদের হাতে। সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করে মৌলবাদের মাধ্যমে প্রকারান্তরে চলমান সমকালকে ধ্বংস করে দিতে চাইছে এরা। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে গোঁড়া মৌলবাদীরা সভ্যতার নান্দনিক বিবর্তনকে স্বীকৃতি দিতে মোটেই রাজি হয় না। আর বুনিয়াদী স্বার্থপর মৌলবাদের পৃষ্ঠপোষকরা সভ্যতা-সংস্কৃতিকে লোক দেখানো স্বীকৃতি দিলেও এটাকে তারা বাণিজ্যকরণের সর্বাত্মক চেষ্টা চালায়। আর বাণিজ্য করতে গেলে তখন প্রগতিবাদ ও মৌলবাদ মিশে একাকার হয়ে যায়। ড. আহমদ শরীফ এই মিশ্রণকে চমৎকার অভিধায় ভূষিত করেছিলেন। তিনি বলতেন, সুবিধাবাদী প্রগতিবাদ ও কট্টর মৌলবাদ মিলে জন্ম নেয় ‘প্রলয়বাদ’। আর এই প্রলয় ধ্বংস করে দেয় মানুষের অগ্রসর হওয়ার সব স্বপ্নমালা। বন্ধ করে দেয় সমাজের উন্নয়নের সব মুক্তপথ।
সমকাল সব সময়ই পরিবর্তনকে সূচি করে অগ্রসর হতে চায় আর দানবিক পেশিশক্তী এক ধরনের ত্রাস সৃষ্টি করে বিনষ্ট করতে চায় সামাজিক সম্প্রীতি। বাংলাদেশে যখন ভোটের রাজনীতি শুরু হয় তখন এসব মৌলবাদী গোষ্ঠী একদিকে অপতৎপরতা চালায়, অন্যদিকে ভোটও চায় সাধারণ মানুষের কাছে। ভাবতে অবাক লাগে, এরা অতীতে পাশও করেছে। গিয়ে বসেছে সংসদেও। অথচ ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই জাতীয় সংসদ, এই জাতীয় সংবিধান-মুক্তিকামী সাধারণ মানুষের নিয়ন্ত্রণেই থাকার কথা ছিল। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানরা শোষণের মানসিকতা ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে বিশ্বে মৌলবাদীকে নানাভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। এখনও করছে।
নিউইয়র্ক, ২০ ডিসেম্বর ॥ ২০০৮
-----------------------------------------------------------------------
দৈনিক ডেসটিনি । ঢাকা । ৩১ ডিসেম্বর ২০০৮ বুধবার প্রকাশিত

প্রকৃতি হত্যার অপরাধ


প্রকৃতি হত্যার অপরাধ
ফকির ইলিয়াস
===========
বাংলাদেশে এখন শীত মৌসুম চলছে। শীতের চাদরে মোড়া গ্রামবাংলা। সদ্য কেটে তোলা ফসলের ধূসর মাঠ। কিছুটা শুষ্ক আবহাওয়া আর শিমুল-বকুল ফুলে সুশোভিত ফুটপাত। পৌষ-মাঘে বাংলাদেশের যে নয়নাভিরাম দৃশ্য অবলোকন করা যায় তা সত্যি প্রাকৃতিক নৈসর্গিক এক অপহৃর্ব সমাহার। এ সময়ে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী বিল-ঝিলগুলোকে আরো মুখরিত করে তোলে বিদেশি অতিথি পাখিগুলো।
বাংলাদেশে এসব পাখির দলগুলো আসে ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা, চীন, সাইবেরিয়া প্রভৃতি দেশ থেকে। ওসব দেশে প্রচ- ঠান্ডা পড়ায় পাখিগুলো দল বেঁধে অবকাশ কাটাতে অপেক্ষাকৃত কম শীতের দেশে চলে আসে। কিন্তু বাংলাদেশে এসে এসব পাখি নিরাপদ থাকতে পারে না। শিকারিদের জাল তাদের বন্দি করে। তারপর পাখিগুলো পণ্য হয় বাজারে বাজারে। শিকারিরা শিকার শিকার বলে চিৎকার দিতে দিতে পাখিগুলো বিত্রিক্র করে দেশের শহরে শহরে। উচ্চবিত্ত ধনীরা চড়া দামে পাখিগুলো কিনে নিয়ে তাদের রসনা তৃপ্তি জোগান।
বাংলাদেশে অতিথি পাখি নিধন চলছে গেল প্রায় দুই যুগ থেকেই। পাকিস্তান আমলে বড় ধনীরা বন্দুকের লাইসেন্স নিতেন। তারপর তারা দলবল নিয়ে বেরুতেন পাখি শিকারে। ঝাঁক ঝাঁক পাখির ওপর চলত তাদের কার্তুজ। তা ছিল এক ধরনের সামন্তবাদী মানসিকতার বিকৃত সুখ। পাখির মাংস বড় জমিদারদের ভোজনবিলাসে রকমারি আইটেম হতো।
মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বন্দুকের লাইসেন্সের ওপর কিছুটা কড়াকড়ি করার পর দলবেঁধে পাখি শিকারের প্রবণতা কিছুটা কমতে থাকে। তাছাড়া দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিবেকবান মানুষের জাগ্রত বিবেকের কাছে হার মানতে থাকে সনাতনী মানসিকতা। বন্দুক বা এয়ারগান দিয়ে পাখি শিকারের প্রবণতা অনেকটা কমে আসে; কিন্তু বেড়ে যায় বাণিজ্যিকভাবে জাল ফেলে পাখি ধরার কার্যত্রক্রম। সরকার এ ব্যাপারে বিধিনিষেধ আরোপ করেও কোনো কার্যকর ভহৃমিকা রাখতে সক্ষম হয়নি। এ বছরের শীতের শুরুতেই পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, উত্তরবঙ্গ, যশোর সীমান্তবর্তী এলাকা এবং সিলেটের জাফলং, তামাবিল, ভোলাগঞ্জ সীমান্ত অঞ্চলে পাখি ধরার ব্যাপক হিড়িক পড়েছে। প্রকাশিত খবর অনুযায়ী আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের নাকের ডগার ওপর দিয়েই চলছে এসব শিকার। সুযোগে এসব সংস্থার সদস্যরাও কামিয়ে নিচ্ছে টু-পাইস।
একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে গেল কয়েক বছর ধরে ইলিশ উৎপাদন অত্যন্ত নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। বাজারে গত বছর ইলিশ মাছ ছিল দুষ্প্রাপ্য। যা পাওয়া গেছে তাও বিক্রি হয়েছে অত্যন্ত চড়া মূল্যে। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশের প্রাণী বিজ্ঞানীরা গত ১০ বছর ধরেই সে আশংকা প্রকাশ করে আসছিলেন। বিশেষ কাজে জাটকা মাছ ধরার প্রবণতা থেকে সে আশংকা প্রকট হয়ে উঠেছিল। জাটকা নিধন বল্পব্দ করার জন্য সরকারি প্রচেষ্টা যথেষ্ট ছিল না। এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী জাটকা নিধন করে টাকা বানাতে ছিল তৎপর। সেই কুফল এখন দেশের জনগণ ভুগতে শুরু করেছেন।
বাংলাদেশের সুস্বাদু ইলিশ মাছের একটি ভালো বাজার ছিল বিদেশেও। ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা, মধ্যপ্রাচ্যের বাঙালি গ্রোসারিগুলোতে বাংলাদেশের ইলিশ মাছের ভালো কাটতি ছিল। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় দেখেছি, ২০০৭ সালের শেষদিকে নিউইয়র্কের বাঙালি গ্রোসারিগুলোতে বাংলাদেশের ইলিশ মোটেই পাওয়া যায়নি। সে স্থানটি এখন দখল করে নিয়েছে মিয়ানমারের তুলনামহৃলক কম সুস্বাদু অপুষ্ট ইলিশ। বাংলাদেশ বঞ্চিত হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা আয় থেকেও।
এটা দুর্ভাগ্যজনক, প্রকৃতির ভারসাম্যতা রক্ষায় বাংলাদেশের সরকার ও সিংহভাগ জনগণ উদাসীন ভহৃমিকা পালন করছে। বৃক্ষ নিধন করে ব্যক্তিস্বার্থ, দলীয় স্বার্থ হাসিল করা হচ্ছে। প্রকৃতি হত্যার অপরাধটুকু কেউ অনুধাবনই যেন করতে পারছেন না। উজাড় হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের বনাঞ্চল। কমে যাচ্ছে ত্রক্রমেই সবুজ আবহ।
পাখি, বাঘ, হরিণসহ প্রভৃতি প্রাণী নিধনের ব্যাপারে বন ও পশুপালন অধিদফতরের নিজস্ব আদেশ ক্রম রয়েছে। কিন্তু খোঁজ করলে দেখা যাবে অনেক পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, মন্ত্রী, আমলাই অতিথি পাখির প্রধান ক্রেতা। হরিণের সুস্বাদু মাংস দিয়ে ভূরিভোজন তাদের প্রিয় সখের অন্যতম।
বাংলাদেশে দুর্লভ জাতের গুই, গোখরা সাপ মেরে এর চামড়া বিত্রিক্র করা হচ্ছে চড়া মহৃল্যে বিদেশে। তা করছে একটি সংঘবদ্ধ দল। মাছ, পাখি, সাপসহ বিভিন্ন প্রজাতির দুষ্প্রাপ্য পশু-পাখি ক্রমেই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ থেকে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে, বাংলাদেশেও এখন ইলিশ মাছ আমদানি করা হচ্ছে মিয়ানমার থেকে। আমদানি হচ্ছে অন্যান্য মাছও। পশু-পাখি সংরক্ষণ এবং পরিবেশ রক্ষায় বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের এগিয়ে আসা উচিত। কারণ এ সমস্যা একটি জাতীয় সমস্যা। দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ বিনষ্ট হলে তার ভুক্তভোগী হতে হবে সারাদেশের মানুষকে। বন ও পরিবেশ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কি একটু দায়িত্বশীল হবে?
--------------------------------------------------------------------------
উপসম্পাদকীয় । দৈনিক সমকাল,ঢাকা। ৭ জানুয়ারী ২০০৯

Sunday, November 16, 2008

কবির অর্ন্তদৃষ্টি,কবিতার যোজন গ্রহপথ


কবির অর্ন্তদৃষ্টি,কবিতার যোজন গ্রহপথ
ফকির ইলিয়াস
===========================================
"[sb]Poets are the unacknowledged legislators of the world."
------- Percy Bysshe Shelley[/sb]
ভিন ভাষা থেকে যখন একটি কবিতা অনুবাদ করা হয়, তখন সঙ্গত কারণেই পাঠকের ইচ্ছে জাগে
মূল ভাষার সাথে কবিতাটিকে মিলিয়ে দেখার। কারণ তাতে জানা এবং বুঝা যায় অনুদিত কবিতাটি কতোটা মৌলিকতা রক্ষা করতে পেরেছে। মার্কিন কবি জেরালন্ড ষ্টার্ণ এর কবিতার বই ‘‘এভরিথিং
ইজ বার্নিং’’(নরটন এন্ড কোম্পানী , ২০০৫) বের হবার পর একটি সমালোচনা ছাপা হয় দ্যা নিউইয়র্ক টাইমসের বুক রিভিউ সেকশনে। সে আলোচনায় কবির কিছু কবিতার ভাবার্থ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। কবি ষ্টার্ণ তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন ,তাই বলেতো আমি আমার কবিতা আবার রিরাইট করতে পারিনা! কবি বলেন,আমার দৃষ্টির সাথে সবার দৃষ্টির মিল থাকবে আমিতো সে কথাও বলছি না।
অনেকগুলো দৃশ্য, কবির চোখের সামনেই মিলিয়ে যায়। কবি তা ধরে রাখেন। পরে সাজিয়ে নেন নিজের মতো করে। আমাদের চারপাশে আমরা প্রতিদিন যে অসংখ্য পংক্তিমালা দেখি , তার সবগুলো কি আমাদের মন কাড়ে? না, কাড়ে না। কবি যে পথে হাঁটছেন , পাঠককে সে পথে হাঁটতে
হবে এমন কোনো কথাও নেই। শিল্প-সাহিত্যে একটা আবহ সবসময় বাস্তবতাকে ঘিরে রাখে।
একটা ছবির আঁচড় ও তো অনেক কথা বলে যায়। সেকথা বুঝতে পারে ক’জন ? ক’জনের মন দেয় এগুলোকে মেধার ছাড়পত্র ?
কবিতা মনের দ্যোতনা ছড়াতে,লিখিত হয় বার বার। আর পঠিত হয় তার চেয়েও বহুগুণ বেশী।এর কারণ একটাই । সবাই লিখতে পারে না। তারপরও মগ্ন উপাসনায় ঋজু হতে চায় সকল বিশুদ্ধ অন্তর।
[sb] যজ্ঞ করি। আগুনে ঢালছি মেঘ। সমুদ্র ও ঝড়
আগুনে ঢালছি আগুন। ঢালছি ঈশ্বরে ঈশ্বর
নিজেকেও ছুঁড়ে ফেলে দিই
স্বাহা বলে ফেলি আকাশের যাবতীয় ঘি

অগ্নি থেকে অগ্নি উঠে আসে। মেঘ থেকে জল
সমুদ্র ফাটিয়ে ওঠে গেঁড়িভুক শোকনীল নাবিকের দল
আমি যজ্ঞ করি আর আগুনের মধুগুলি চেটেপুটে খাই
নিজেরেও সমগ্র পোড়াই

জঙ্গল শুন্য করে ছুটে আসে গাছপালা, গুল্ম ও লতা
ছায়াপথ শুন্য করে ছুটে আসে অন্ধ নীরবতা
মাটি ফুঁড়ে ওঠে আসে ওঁম তৎ সৎ
যজ্ঞ করি। নিজেকে আগুনে ঢালি। পোড়ে ভবিষৎ ।
( যজ্ঞ / বিকাশ সরকার )[/sb][si][/si]
কবি যাই বলুন না কেন, ভবিষ্যতই নির্মিত হয় আগুয়ান প্রজন্মের হাতে। যারা এই সমকালকে শিয়রের বালিশ করে মহাকালের কোলে নিশিরাত ঘুমায় । আবার জাগে। প্রতিদিন নতুন সূর্য কামনা করে।
[sb]দুই[/sb]
আমাদের মননে , বাংলা সাহিত্যে শামসুর রাহমান এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর মুখ থেকে জীবনের শেষ
মুহুর্ত পর্যন্ত আমরা শুনেছি আশার বানী।
বাংলাদেশ যখন জঙ্গীদের লীলাক্ষেত্র , কবি বলেছেন - এ আঁধার কেটে যাবে। এই যে স্বপ্নচারী মন,
সেই মনের মেরুপথেই হাঁটে কবিতা।
যুগে যুগে বদলে যায় কবিতার ক্ষেত্র। বদলে কবির অভিজ্ঞতাও ।

[sb]একটা মুদ্রা পেলেই অমনি আমি কুয়ার জলে ফেলে দিতাম। তোমার চোখের মতো,যে মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ দু’পিঠেই থাকে ঈশ্বর , মুদ্রা পতনের সাথে সাথে ঈশ্বর কেঁদে উঠতো , আর তার কান্নার ভেতর দেখতে পেতাম অদৃশ্য এক ঘোড়া ,যে ঘোড়া ঘাড়েকরেছে সূর্য , পায়ের ভেতর নিয়েছে দৌড়ের পদাবলী সেই জন্মাবধী, একটাভোররাতের পাশে দাঁড়িয়ে আছো তুমি আলোর পাথর আর সেখানে পড়ে আছে নর্তকীদের ভাঙা পা , কেবল আমার হাতে একটা মুদ্রা এলেই কুয়ার জলে জমে ওঠেঈশ্বরের কান্না, ভেসে ওঠে মুদ্রার শ্বাপদ আর তোমার পৌরাণিক গায়ে জমে ওঠে ভোররাতের লীলা।
( পাথর শুধু অন্ধকার হতে থাকে -চার / জুয়েল মোস্তাফিজ )[/sb][si][/si]
কবিতার এমন নবতর আকাংখা প্রতিদিনই উঠে আসে। নিয়ত মৃত্তিকাকে সামনে রেখে কবি
ভেসে যান বৃষ্টিসমুদ্রে। আর তা তাবৎ মানুষের অলৌকিক সমষ্টি শক্তিই বলা যায়।
একটা কথা আমরা সবাই জানি , মানুষের মনোজগতে একধরনের গোপন আড়াল সব সময়ই থেকে যায়। মানুষ মূলতঃই একা এবং অভিন্ন। বেদনার বর্ষায় লিখিত কোনো কবিতার চিত্রলকল্প তাই হয়তো প্রতিটি মনকে এককভাবেই দোলা দেয়। ঢেউ জাগিয়ে নিয়ে যায়
অন্যস্রোতে। স্মরণ করতে পারি জীবনানন্দ দাশকে আবারো বিনয়ের সাথে।
[sb]এখানে নক্ষত্রে ভরে রয়েছে আকাশ
সারাদিন সূর্য আর প্রান্তরের ঘাস ;
ডালপালা ফাঁক করে উঁচু উঁচু গাছে
নীলিমা কি চায় যেন আমাদের পৃথিবীর কাছে।

চারদিকে আলোড়িত রোদের ভিতরে
অনেক জলের শব্দে দিন
হূদয়ের গ্লানি ক্ষয় কালিমা মুছিয়ে
শুশ্রুষার মতো অন্তহীন।
( এখানে নক্ষত্রে ভরে / জীবনানন্দ দাশ)[/sb][si][/si]
এই যে অমর শুশ্রুষা, তা ই মানুষকে আলো দেয় যোগাত্মক নিয়মে। এর কোনো বিকল্প নাই। আর নাই বলেই একজন বাউল কবি কিংবা একজন নাগরিক কবি দুজনেই এসে মিলিত হয়ে যান একই সড়কে। যে সড়ক ধারণ করে চলেছে অগণিত পদচিহ¡। অগণিত নোখের আঁচড়।
তাই সমকালের একজন কবিও খুঁজেন সেই অদৃশ্যতাকে। তার কণ্ঠ হয়ে উঠে সবকালের কোনো সমর্পিত কবিকণ্ঠ।
[sb]যে বুঝে বেদনার কথা
তারে ডাকি স্বজনের নামে
তার নামে ডাক পাঠাই দু’চোখের খামে
যে পাবার সে পেয়েছে
কথার মাহাত্ম্য গোপন রেখেছে সেইজন
নিঃশব্দে, আমার মুখে সে পড়ে
ভিতর ভাঙে ধীরে ইচ্ছে আলোড়ন।
( অদৃশ্য / মাশুক ইবনে আনিস )[/sb][si][/si]
এই ধীরে বয়ে যাওয়া প্রশ্বাসই কবিকে দিয়ে লিখিয়ে নেয় কালের কবিতা।
[sb]তিন[/sb]
একজন কবি বলতেই পারেন, আমার নিজস্ব কোনো ঘর নেই। এই পৃথিবীটাই আমার
ঘর। আমার নিজস্ব কোনো ভাষা নেই, মানবসত্তার নিঃশ্বাসই আমার ভাষা।
কার্তিকের মাঠে দাঁড়িয়ে আছেন কবি। আর ক’দিন পরেই অগ্রহায়ন। আমার কেন জানি মনে হয় ‘গ্রহন’ শব্দটির সাথে আগ্রহায়ন মাসের একটা মিল কোথাও আছে। ফসল তোলার দিনকে সামনে রেখে মানুষ তার ভবিষ্যতের স্বপ্ন নির্মাণ করে যায় নিরন্তর।
প্রেমিকাকে জানিয়ে দেয় , সামনে শুভদিন। আদিকাল থেকে এই যে শুভদিনের প্রত্যাশা, তা ই একেকটা কবিতা।
[sb]দারচিনি দিনে- - - দিঘীমুখি হয়েছে মেঘ
সুষম প্রমোদে
এই প্রবণ - পাখি জানে
কী র- আছে পরাণে।
এখন সন্ধ্যার ডাকে - - - চাঁদ ফেরে
তোমার ধারণা গাঁয়
বেহাত বৈভবে একদিন তুমি
জেনে যাবে লীঢ় অনুরাগ
বিতং বিজনে থেকে যাই আজ।
( থেকে যাই আজ / ফজলুররহমান বাবুল )[/sb][si][/si]
বিশ্বের কোথায় কি কবিতা লিখা হচ্ছে তা জানা , খোঁজা এবং বুঝা কেও একজন প্রকৃত কবির দায়িত্ব বলে আমি মনে করি। কারণ ,কবিতার সমকালকে না জানলে বিবর্তন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া কঠিন।
শেলী বলেছেন , কবিরা হচ্ছেন বিশ্বের অস্বীকৃত সংবিধান নির্মাতা। যারা কালে কালে মানব সভ্যতার কাঠামো নির্মাণ করে যান।
মার্কিন কবি জ্যাক গিলবার্ট বলেন ,আমাকে পড়তে হয়। সমসাময়িক কবিতা না পড়লে নিজেকে লাইনচ্যুত ট্রেন মনে হয়।
আগামীর কবিতা কেমন হবে তা কেউ বলতে পারবে না। তবে কবি তার কল্পসুতো টেনে রেখে যাবেন সুন্দর ভবিতব্যের জন্য।
[sb]যে কথা বাতাসে কোকিল হয়ে ওড়ে কেবল তারই
আঁচড়ের স্বর শুনি; পাতার মধ্যে শুয়ে পড়ে
আকাশমুখী পাখিগুলিকে বানাই কানের দুল।
দগ্ধলতায় , বনমানুষের পাড়ায় দূর নদীতে লঞ্চ চলার শব্দে
জমে ওঠে বাতি পোড়া অরিন্দমি নিরবতা । নঝুম জোনাকির
আলোকগন্ধে নাকফুলে বাজাই বিজলীর তবলা;
দূর চলে আসে ক্রমশঃ গলির মোড়ের চায়ের স্টলে
মাথায় পিয়ানো বাজানো সবুজ বালিশ পেতে।
( সোনার হ্যারিকেন ও শিস বাজানো মাছ - সিরিজ / ফেরদৌস মাহমুদ[/sb][si][/si] )
কবিতাকে এগিয়ে নিয়ে যাবার দায়িত্ব কারো একার নয়। সবার । সকলের। যারা লিখবে, যারা পড়বে। অনুপ্রাসের যে ধ্যানগরিমা, তার অমিত তেজ কেউ নেবে কি নেবে না,সে স্বাধীনতা সবার হাতে পৌঁছে দিয়েই কবিতা এগিয়ে যেতে ভালোবাসে।
[sb]সমুদ্র নিকটে আসে বহু বহুবার মানুষ আসে না ।
আকাশ অনেক বাসে বহু বহুবার মানুষ বাসে না।
( বিনয় মজুমদার প্রসঙ্গে একটা কবিতা / অশোক দাশগুপ্ত )[/sb][si][/si]
কবিতার এই নক্ষত্র রাজ্যে কবির বুনন যে সিঁড়ি তৈরি করে যায় , তা মহাকালে সমর্পিত হবে
এই বিশ্বাস ই আরেকটা কবিতার জন্ম দেয়।
[sb]চার [/sb][si][/si]
একটি কবিতা কতোটা কবিতা হয়ে উঠলো সে বিষয়ে কবির কতোটা খেয়াল রাখা দরকার , তা নিয়েও ভিন্নমত থাকতে পারে। কিন্তু সর্বোপরি কবি যদি যা ইচ্ছে তা,লিখে কবিতা বলে চালিয়ে দিতে
চান তাও বর্জন করার অধিকার রাখে মহাকাল।
[sb]মানুষের সবকথা শেষ হয়ে গেল এইখানে এসে
সারদিন সারারাত ভোরের রৌদ্র-বাদল শেষে-
অনেক মৃতের হাড় গড়িয়ে পড়েছে ক্রমশঃ নিঝুম
প্রান্তরের দিকে- আর তোমার চোখের মণিতে ঘুম
আর মৃত্যু নিয়ে , ভালোবাসা নিয়ে তারা রাতজাগা জলের কুসুম
নিয়ে-মানুষ কেন এসেছিল একদিন যদি আর না-ই পাবে ওম ?
তুমিও বা এসেছিলে কেন? মগ্ন-জোৎসনার রাতে
কেন তুমি এসেছিলে ফড়ি- সকাল নিয়ে হাতে?
বলে না সে -‘না’ -বলা মুখের পরে এসব উত্তর
নির্জনে লিখে রেখে গেছে সেই শতাব্দীর স্বর ।
(মধু বৃক্ষ প্রতারণা বিষ - চৌদ্দ / আলফ্রেড খোকন )[/sb][si][/si]
লিখে যাবার জন্যই হয়তো এসেছিল সবাই । কিন্তু পারেনি। পারছে না। অনেকে একজন কবিকে দশকের বৃত্তে বন্দি করতে চান না। কবিতার ইতিহাস বলে , যে কোনো কবির কবিতায় তার সমকালের ছাপ পড়বেই। দশক বরং মেধার সাথে বয়সের সমন্নয় ঘটিয়ে কবির নিজস্ব পরিমন্ডল
গড়ে তুলে।তার পরিচয়ের বিকাশ ঘটায়।ইউরোপ-আমেরিকার নামী প্রকাশনীগুলো তাই দশকওয়ারি কবিতার সংকলন প্রকাশ করে সে সময়ের দলিল প্রণয়ন করতে আগ্রহ দেখায়। সহস্র যোজন পথের উৎসমুখ তৈরি করে রাখে। সবচেয়ে বড়কথা হচ্ছে নিজের পদছাপ রেখে যাবার কৃতিত্ব। যা কেবল একজন ধ্যানী কবিই পারেন।
ক’জন নবীতম কবির জবানীতে এমন কিছু চিত্রকল্প দেখা যাক।
[sb]১ প্রতি সন্ধ্যায় পুরোনো গাঙুর নদীটি উৎসবের সুরে
ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে দু’তীর বেহুলার মতো মূক হয়ে যায়
আমার লখিন্দর ভাইটি তবু জেগে উঠে না বিস্মরণের ভোরে
( রোদ রঙ ঘোড়া চরিত/ সুমন সুপান্থ )
২ অই যে পূর্বাকাশে লাল পাগড়ি ওড়াচ্ছেন প্রতি প্রত্যুষে
উনি অহম
অই যে লজিং মাস্টার সন্ধ্যার ফ্রক দেখছেন খুঁটে খুঁটে
উনি ঈর্ষা
( শিরোনামহীন-১২ / মাজুল হাসান )
৩ পর্যাপ্ত প্রবাসে উড়ে যাও পাখি
আমি রাখি প্রহরায় - ফেলে যাওয়া পালকের স্তুপ
গতকাল থেকে এল নিশ্চুপ গান , ফের মুখোমুখি
( পাখিকাতরতা / ইফতেখার ইনান )
৪ এ শহরে কারো কারো রাত সঙ্গম মুখর
আর কেউ কেউ বেদনার সুতো বোনে-
রাত এলে পরে
নিজের কবর নিজেই খুঁড়তে শুরু করে
( রাত নেমে এলে / আসমা বীথি )
কবিতা জীবনের উদ্ধার এনে দেয়।কবিতা মহাসাগরের তীরে বসে একজন মানুষকে আত্মমগ্ন
হতে শেখায়। আমার সবসময়ই মনে হয় একটি দীর্ঘ কবিতার কক্ষপথে পরিভ্রমন করছে
আপামর সৃষ্টিকুল। # #
-----------------------------------------------------------------------------
দৈনিক ডেসটিনি/ ২৩ মে ২০০৮ শুক্রবার প্রকাশিত

Saturday, November 15, 2008

ক্রান্তিকালের নির্বাচন ও গণবিচ্ছিন্ন রাষ্ট্ররক্ষকেরা


ক্রান্তিকালের নির্বাচন ও গণবিচ্ছিন্ন রাষ্ট্ররক্ষকেরা
ফকির ইলিয়াস
---------------------------------------------------------------------------------
একটি রাষ্ট্রের রক্ষক কিংবা ত্রাতা কখনই কোন ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠী হতে পারে না। একটি দেশে তার নিজস্ব প্রকল্পের পরিভ্রমণ থাকে। প্রজন্ম বেড়ে ওঠে। যোগ্য নেতৃত্ব সামনে এগিয়ে আসে। এক সময় তারা রাষ্ট্রের নেতৃত্বভার গ্রহণ করে। এটাই হচ্ছে স্বাভাবিক নিয়ম। এই নিয়ম থেকে ব্যত্যয় যে ঘটে না তা বলছি না। কিন্তু মানুষের অগ্রসরমাণ চেতনাকে দমিয়ে রাখা যায় না। উচিতও নয়।
একটি দেশে দু’ চার শ’ দুর্নীতিবাজ নেতা নির্বাচন করতে না পারলে সে দেশের রাজনীতি থমকে থাকার কথা নয়। কারণ প্রতিটি দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক বলয় থাকে। সামনের সারিটি ব্যর্থতার জন্য কুপোকাত হলে পেছনের সারি সামনে চলে আসে এবং দায়িত্ব নেয়। দেশকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
বাংলাদেশে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তেমনি নানা মেরুকরণ হচ্ছে। দেড় দু’ শ’ নেতা এমপি পদে প্রতিদ্বëিদ্বতা করতে পারবেন না বলে সংবাদ বেরুচ্ছে পত্রপত্রিকায়। কেন তারা নির্বাচনের মাঠে খেলোয়াড় হতে পারবেন না তা কারও অজানা নয়। এরা হয়তো দণ্ডিত। না হয় মামলার সম্মুখীন। দেশের নির্বাচনী আচরণবিধিকে সম্মান করলে তাদের উচিত নিজে থেকেই সরে দাঁড়ানো; কিন্তু তারা তা হয়তো করবেন না। তাই বাধ্য হয়েই তাদের অকার্যকর করে দেয়ার কথাটি আসছে।
কথা হচ্ছে যারা দুর্নীতিবাজ বলে প্রমাণিত তারা আবার জনপ্রতিনিধি হতে যাবেন কেন? তারা তা হতে চান নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য। এ জন্য তারা মরিয়া। মারমুখো হয়ে নানা ধরনের জঘন্য আচরণ করছেন প্রকাশ্যে। টিভিতে একটি সচিত্র প্রতিবেদন দেখলাম। বিএনপির সাবেক সাংসদ নাসির উদ্দিন পিন্টু একজন জেল পরিদর্শকের ওপর চড়াও হয়েছেন।
নাছির আহমেদ নামক এই পুলিশ অফিসার প্রকাশ্যে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, পিন্টু তাকে ঘুষি মেরেছেন। কি বর্বর আচরণ। কি জঘন্য হীনম্মন্যতা। জেলে থেকে যে রাজনীতিক এমন আচরণ করতে পারছে বেরিয়ে এলে তার আচরণ কেমন হবে? এ রকম নেতাই আজ বিএনপি থেকে ভোটে দাঁড়াতে চায়। এরাই হতে চায় এই দেশ এই জাতির ভবিষ্যৎ রক্ষক? এমন নানা কঠিন এবং জটিল প্রশ্নগুলো নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। দেশের একটি প্রধান দল বিএনপি খাবি খাচ্ছে তাদের নিজেদের তৈরি জলাশয়ে। কারণ তারা এমন কাউকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। যে দানবতন্ত্র বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেছিল সেসব দানব এখন দলছুট। কেউ বিদেশে, কেউ পলাতক, কেউ জেলে, কেউ গণবিচ্ছিন্ন। এসব রাষ্ট্ররক্ষক নামের দানবরা জেলে থেকেই যে কতটা ভয়ঙ্কর সেটাই প্রমাণ করেছে পিন্টু নামের সাবেক সাংসদ।
বিএনপি আসলে কি চাইছে? তারা কি চাইছে তাদের সেই পরিকল্পিত নির্বাচন? যদি তা না হতো তবে তারা একের পর এক দাবি দিয়ে মাঠ ঘোলা করার চেষ্টা করছে কেন? তাদের দাবি মেনে মনোনয়নের মেয়াদ বাড়ানোর পরও খন্দকার দেলোয়ার ‘সাজানো’ পাতানো নির্বাচনের গ খুঁজে বেড়াচ্ছে কেন?
বিএনপির সন্দেহকে পাকাপোক্ত করা হয়েছে শেখ হাসিনার ১৮ ডিসেম্বরের নির্বাচনের জোর দাবির মাধ্যমে। শেখ হাসিনা কিছুটা বেশি আগে বেড়ে এমন দাবির সীলমোহরটি না মারলেও পারতেন। কেউ না এলেও আওয়ামী লীগ নির্বাচনে যাবে কিংবা ১৮ ডিসেম্বর নির্বাচন হতেই হবে এমন দৃঢ় দাবির মাধ্যমে শেখ হাসিনা অদ�রদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন বলেই আমি মনে করি। কারণ এটা ধ্রুব সত্য, কেয়ারটেকার সরকার তাদের হিসেব না মিললে সহজে নির্বাচন দেবে না। আর বিএনপিবিহীন নির্বাচিত সরকারের মেয়াদ হবে ক্ষণস্খায়ী। তাই বিএনপিকে নিয়েই নির্বাচন করতে আগ্রহী সরকার। এ ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার উচিত ছিল, পরিস্খিতি গভীর পর্যবেক্ষণ করে বরং নিজের দলও জোটকে আরও সংগঠিত করা। তা না করে শেখ হাসিনা তদারকি সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নে কেন অগ্রণী হতে চাইলেন তা বোধগম্য নয় কোন মতেই।
দুই.
নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই নতুন নতুন যোগ-বিয়োগ লক্ষ্য করছি আমরা। জামিন না দিয়ে নিজামী, মুজাহিদ সাইফুর রহমানকে জেলে পাঠানো হয়েছে। লক্ষ্য হচ্ছে এদের নির্বাচন থেকে বিরত রাখা। তারা আবার জামিনে বেরিয়ে আসবেন কিংবা সহজেই জামিন পাবেন ঘটনাবলীর চলমানতা আপাতত সে সাক্ষীই দিচ্ছে। এদিকে ড. কামাল, বি চৌধুরী, কাদের সিদ্দিকীরা নতুন ফ্রন্ট গঠনের ডাক দিয়েছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, তাদের প্রস্তাবিত ফ্রন্টের সব দল মিলিয়ে দেশে তাদের জনপ্রিয়তা কত শতাংশ? প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনও এমন জেলা আছে যেসব জেলার মানুষ বিকল্প ধারা, গণফোরাম কিংবা কল্যাণ পার্টির নামও জানে না। তা হলে তো সংস্কারের নামে এসব ফন্সন্টবাদীরা বরং ডানপন্থী মোর্চার পারপাসটাই সার্ভ করছেন। যোগ্য প্রার্থী দেয়ার নামে কিছু ভোট কেটে নিয়ে ডানপন্থী জাতীয়তাবাদীদের বিজয়ের পথ প্রশস্ত করে দিচ্ছেন। তারা সমমনা বড় দলের মোর্চায় যোগ দিয়েই বরং এই ক্রান্তিকালের নির্বাচনটি পার হতে পারতেন। তারা তা করছেন না। যা জাতির জন্য মোটেই কল্যাণকর নয় এ মুহ�র্তে।
দুদক চেয়ারম্যান হাসান মশহুদ চৌধুরী বলেছেন, জামিন পাওয়া আর মামলা থেকে অব্যাহতি এক কথা নয়। দুদক চেয়ারম্যান আশা প্রকাশ করে বলেছেন, তারা আসামিদের প্রমাণপত্র সাপেক্ষে সুবিচারের মুখোমুখি করতে পারবেন। কিন্তু আমরা দেখছি প্রধান দুই নেত্রীকে প্রায় সবক’টি মামলা থেকেই ক্রমশ অব্যাহতি দেয়া হচ্ছে। তাহলে বাকিদের ব্যাপারে কি হবে? তা দেখার জন্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে মাত্র।
দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারকাত নিউইয়র্কে বলেছেন, ওয়ান ইলেভেন মূলত ছিল আমাদের কোমর ভেঙে দেয়ার একটি প্রচেষ্টা। হঠাৎ করে সবকিছু তছনছ করে দিয়ে রাজনীতি স্খবির করে দেয়া মাত্র। কার্যত সেটাই পরিলক্ষিত হচ্ছে। এবং এর রেশ ধরে নির্বাচন হবে কি না তা নিয়েও সংশয়ে ভুগছে দেশবাসী। মানুষ এটাও লক্ষ্য করছে, ব্যারাকঘেঁষা এক শ্রেণীর মুখপাত্র সাংবাদিক ইতোমধ্যে নির্বাচন পিছিয়ে দেয়ার ‘খোলা সুপারিশ নামা’ও পেশ করতে শুরু করেছেন। তা হলে কি এই ক্রান্তিকাল দীর্ঘ করার কোন গোপন ইচ্ছে কোথাও লালিত হচ্ছে?
দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য গণতন্ত্র প্রয়োজন। দেশের প্রজন্মকে বাড়িয়ে তোলার জন্য গণতান্ত্রিক সরকার প্রয়োজন। জরুরি আইন কখনই কোন রাষ্ট্রে স্খায়ী সমাধান দেয় না, দিতে পারে না। জরুরি আইন গণবিচ্ছিন্ন রাষ্ট্ররক্ষকদের মানুষের কাছে চিহ্নিত করে যায়। আর মানুষ তা থেকে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করতে শেখে।
নিউইয়র্ক ১১, নভেম্বর ২০০৮
---------------------------------------------------------------------------------
দৈনিক সংবাদ । ১৪ সেপ্টম্বর ২০০৮ শুক্রবার প্রকাশিত

Saturday, March 8, 2008

বিবর্তন, বৈষম্য ও সৃজনশীলতার পূর্বশর্ত


বিবর্তন, বৈষম্য ও সৃজনশীলতার পূর্বশর্ত

ফকির ইলিয়াস

=================================

রক্ষণশীল সমাজ ব্যবস্থা প্রাচ্য কিংবা পাশ্চাত্যের সব দেশেই আছে। একটি সমাজ নির্মাণে সে সমাজের মানুষের পরিশুদ্ধ অংশগ্রহণই নিশ্চিত করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুন্দর দিন। আর সে অংশগ্রহণ কিন্তু নারী এবং পুরুষের সমান ভাবেই হতে হয়। এমন এক সময় ছিল, যখন নারীশিশু জন্ম নিলে তাকে জীবন্ত পুঁতে রাখার আদিমতা ছিল সামজে। অথচ মানুষ সে সময়ও ছিল বিবর্তনবাদী। প্রশ্ন হচ্ছে মানুষ যদি সভ্যতা সুন্দর এবং সত্যের স্বপক্ষে বিবর্তনবাদীই হবে, তবে মাঝেমাঝে এখনো আদিমতা গ্রহণ করবে কেন?আমরা কতগুলো উদাহরণ দেখি এখনো প্রাচ্যের সমাজে। পুরুষতান্ত্রিক শক্তির ব্যবহার কখনো কখনো আমাদের ভুলিয়ে দেয়, এ সমাজে নারী নামের আরেকটি লিঙ্গের মানুষ আছে। শাসনের বিভিন্ন জাঁতাকলে আছে। এগুলোর মধ্যে রাষ্ট্রীয়, তত্ত্বীয়, ধর্মীয় এবং সামাজিক শাসনগুলোই প্রধান। আমরা দেখব যারা ফতোয়া দিয়ে বেড়ান, তারা কিন্তু ফতোয়াগুলোর নিরানব্বই ভাগই জারি করেন নারীদের বিরুদ্ধে। পুরুষের বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করে তাকে বড়জোর একঘরে করে রাখা যায় কয়েকমাস। তারপর সে আবার সমাজে উঠে আসে। কোনো পুরুষকে দোররা মারার ঘটনা আমরা কখনো শুনিনি। অথচ নারীকে দোররা মেরে মাটিতে পুঁতে হত্যা করার মর্মান্তিক ঘটনাও আমরা দেখেছি। ধর্ম এবং সমাজের মিশ্রণে এই যে পেশিশক্তির দাপট তা একটি শুদ্ধ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নির্মাণে হুমকি বৈকি!যেসব নারী গণিকাবৃত্তি করে তাদের সমাজ পতিতা বলে আখ্যায়িত করে খুব সহজে। প্রাচ্যে এবং পাশ্চাত্যে এই আখ্যায়ন চলছে এখনো। কিন্তু যে পুরুষ গণিকালয়ে যায় তাকে ‘পতিত বলে’ সমাজ আখ্যা দেয় না। দিতে পারে না। কেন পারে না? এতে বাধা কোথায়?আজ থেকে তিন দশক আগেও মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর নারীদের কর্মসংস্থান বিষয়ে নানা অলিখিত নিষেধাজ্ঞা ছিল। তা এখন ক্রমশ সরতে শুরু করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সরকারি দফতর, ব্যাংক বীমা, হাসপাতাল, ডাকঘরসহ অনেক সরকারি বেসরকারি অফিস, প্রতিষ্ঠানে এখন নারীদের কর্মসংস্থানের দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। আর তা সম্ভব হয়েছে সামাজিক ধ্যানি-চেতনার কারণেই। সামাজিক লিঙ্গ বৈষম্যের বিভিন্ন ধাপ আমরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে লক্ষ্য করি। ইসলাম ধর্মে এক ছেলে সন্তানের সমান পরিমাণ মালামাল দু’মেয়ে সন্তান পাবে এমন একটি রেওয়াজ ছিল। তা বিভিন্ন দেশে এখন সংস্কার করা হয়েছে। একটি মেয়ের যদি একটি ভোট হয়, একটি ছেলেরও তেমনি একটি ভোট। তাহলে রাষ্ট্রে পৈতৃক মালামাল, সম্পত্তি পেতে বৈষম্য হবে কেন? বলা যায় বিয়ের প্রথার কথাও। একজন পুরুষ একসঙ্গে চারজন স্ত্রী রাখতে পারবে। কিন্তু একজন নারী একসঙ্গে একাধিক স্বামী রাখতে পারবে না। এই যে স্বীকৃত প্রথা ইসলাম ধর্মে রয়েছে, এর সহজ কোনো সমাধান আপাত দৃষ্টিতে নেই। যদি সামাজিকভাবে মানুষ তা গ্রহণ কিংবা বর্জনে রাজি না হয়।দুই. বিতর্কিত অনেক প্রথা অনেক ধর্মেই আছে। হিন্দু ধর্মে সতীদাহ, অকাল বৈধব্যের পর আর বিয়ে না করা প্রভৃতি কার্যক্রম কোনো সভ্য সমাজেই গৃহীত হতে পারে না। যারা কট্টরপন্থী জুইশ (ইহুদি) ধর্মাবলম্বী, সে সমাজের নারীদের বিয়ের পরই তাদের চুল কেটে ফেলতে হয়। তারপর তাদের পরচুলা ব্যবহার করতে হয়। স্বামীর মনোরঞ্জন ছাড়া অন্য কোনো পুরুষের যাতে দৃষ্টি কাড়তে না পারে সেজন্য হাইহিল জুতা, টাইট ফিটিংস কাপড়চোপড় তারা পরতে পারে না। এমনকি প্রচলিত আছে, জুইশ ধর্মাবলম্বী কট্টরপন্থী পুরুষরা তাদের স্ত্রীকে সন্তান ধারণে বাধ্য করে অনেকটা বলপূর্বক। অনেকটা ইচ্ছার বিরুদ্ধেই।ইউরোপ-আমেরিকার জুইশ ধর্মাবলম্বী কট্টরপন্থীরা তাদের ছেলেমেয়েদের বিয়ে শাদীর ব্যাপারেও পরিবারের অগ্রজদের মতামতকে চাপিয়ে দেয়। অ্যারেঞ্জড কিংবা সেটেলম্যারেজ প্রথা শুধু বাঙালি সমাজ ব্যবস্থায় নয়, আইরিশ, ইতালিয়ান, গ্রিক, জুইশ, রাশিয়ান সমাজেও আমরা প্রত্যক্ষ করি। আর এসব সমাজের দাম্পত্য জীবনে শান্তি এবং অশান্তি দুটোই কিন্তু থেকে যাচ্ছে সমানভাবে। এসব দায় থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হচ্ছে সমঝোতাপূর্ণ জীবনযাপন। তা যে কোনো দেশে যে কোনো সমাজেই হোক।লিঙ্গের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার একমাত্র পূর্বশর্ত হচ্ছে আইনের শাসন। গেল কিছুদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সি অঙ্গরাজ্যের একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। এক দম্পতি ডিভোর্স চেয়ে পারিবারিক আদালতের শরণাপন্ন হয়েছিল। এ সময়ে স্বামী স্টেট লটারিতে পাঁচ মিলিয়ন ডলার জিতে যায়। স্ত্রী আইনানুযায়ী তার অর্ধেক দাবি করে। স্বামী বলে আমরা ডিভোর্স ফাইল যেহেতু করেছি, তাই স্ত্রী অর্ধেক অর্থমূল্য পাবে না। কিন্তু আইনি মারপ্যাঁচে হেরে যায় স্বামী। মাননীয় আদালত রায় দেন যেহেতু ডিভোর্স প্রক্রিয়াটি এখনো সম্পন্ন হয়নি তাই স্ত্রী লটারির অর্ধেক অর্থমূল্যের ভাগীদার। একটি রাষ্ট্রে সুষ্ঠু আইনি বিচার এবং সততা থাকলেই সমঅধিকারের বিষয়টি পূর্ণতায় রূপ নেয়া সহজ হতে পারে।আবারও ধরা যাক বাংলাদেশের মহান মুক্তি সংগ্রামের কথা। এই স্বাধীনতা সংগ্রামে নারীদের যে স্বর্ণোজ্জ্বল অবদান, তা কি সরকারিভাবে ব্যাপক স্বীকৃত হয়েছে? না, হয়নি। এমনকি যারা বীরাঙ্গনা, যারা তাদের মহামূল্যবান সম্ভ্রম হারিয়ে ছিলেন আমাদের বিজয়ের জন্য তাদের কিন্তু প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা যথার্থ সম্মান দেয়নি। কেন দেয়া হয়নি? কেন এই দীনতা!ব্যক্তিস্বাধীনতা কিংবা আধুনিকতা মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু আধুনিকতার লেবাসে উগ্রতা, বেহিসেবীপনা কোনো সমাজই গ্রহণ করে না। যেসব কর্ম সমাজ কিংবা প্রজন্মকে ধ্বংস করে দিতে পারে তাকে তো আর ব্যক্তিস্বাধীনতা বলা যায় না। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে ইউরোপের কিছু কিছু দেশে যৌন উগ্রতার নামে মানব সভ্যতাকে ধ্বংসের কর্মকা- পরিচালনা করা হচ্ছে। যেমন অবৈধ মাদক দ্রব্যের বিক্রি লাইসেন্স নিয়ে ইউরোপের কোনো কোনো দেশে আইনি দেনদরবার চলছে। মাদক দ্রব্য গোটা মানব জাতির জন্যই মারাত্মক ক্ষতিকর। সে নারী কিংবা পুরুষ হোক।সমান অধিকারকামী সমাজ প্রতিষ্ঠার অন্যতম শর্ত হচ্ছে একটি রাষ্ট্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, যা নারী-পুরুষের অধিকারের নিরাপত্তা, নিশ্চয়তা দেবে। মানুষ মানুষের হাতে নিগৃহীত হবে না। মানুষ মানুষের কাছে প্রতারিত হবে না। তারপরের শর্তটি হচ্ছে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা। মনে রাখতে হবে সৃজনশীল বিবর্তনই মানুষকে এ জন্য সাহায্য করেছে। এর পাশাপাশি পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতাই হতে পারে সমাজ নির্মাণের মূলমন্ত্র।

---*************-------------------দৈনিক ডেসটিনি।ঢাকা।৯মার্চ ২০০৮ রোববার প্রকাশিত

Tuesday, March 4, 2008

সুবিচার যখন প্রধান নাগরিক প্রত্যাশা


সুবিচার যখন প্রধান নাগরিক প্রত্যাশা

ফকির ইলিয়াস

================================

দুর্নীতির অভিযোগে ফেঁসে যেতে পারেন নিউইয়র্কের সাবেক পুলিশ কমিশনার বার্নার্ড কেরিক। তার বিরুদ্ধে মারাত্মক অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। ইন্টারনাল রেভিন্যু সার্ভিস (আইআরএস) বলেছে, তার আয়ের সঙ্গে ট্যাক্স প্রদানের সঙ্গতি নেই। এসব অর্থ কী করে অবৈধভাবে অর্জন করা হয়েছে? এমন অনেক প্রশু এখন মুখে মুখে। যদি তিনি দোষী সাব্যস্ত হন তবে যাবজ্জীবন কারাভোগ করতে হতে পারে। ইউএস অ্যাটর্নি বলেছেন, তিনি পুলিশের চিফ ছিলেন। সেই ব্যক্তিই যদি এমন দুর্নীতিগ্রস্ত প্রমাণিত হন তবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতিই মানুষ বিশ্বাস হারাবে। বার্নার্ড কেরিক নিউইয়র্কের সাবেক মেয়র জুলিয়ানির ঘনিষ্ঠ জন। নাইন-ইলেভেনের সময়ও তিনিই ছিলেন পুলিশ কমিশনার। পরবর্তী সময়ে অবসরে যাওয়ার পর হোমল্যান্ড সিকিউরিটি মন্ত্রণালয়ের প্রধান অর্থাৎ সেত্রেক্রটারি অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি হিসেবেও কেরিকের নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল। সে সময়ই তার বিরুদ্ধে বিস্তর দুর্নীতির অভিযোগ আসে। বার্নার্ড কেরিক তার নাম প্রত্যাখ্যান করে নেন। কিন্তু তদন্ত তার পিছু ছাড়েনি। সেসবের অংশ হিসেবেই এখন তিনি দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পথে। মামলার রায়, আপিল শুনানি সবকিছুর আইনি প্রত্রিক্রয়া সমাপ্ত হলে রায় তার অনুকূলে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা আপাতত নেই।বার্নার্ড কেরিকের নাম বাদ পড়ার পরই মাইকেল শের্টফকে প্রেসিডেন্ট বুশ হোমল্যান্ড সিকিউরিটির প্রধান হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেন। যিনি এখনো এই পদে বহাল আছেন। এদিকে কেরিকও একজন সুপরিচিত রিপাবলিকান ধনপতি। পুলিশের চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর নিজের ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু পুলিশ কমিশনার হিসেবে তিনি কি অবৈধভাবে আয় করেছেন? এসব প্রমাণের জন্যই সরকার পক্ষ এখন নেমেছে কোমর বেঁধে। এই যে আইনি প্রক্রিয়া তা সবার জন্যই সমান থাকা বাঞ্ছনীয়। এর আগে ইন্টারনাল রেভিন্যু সার্ভিসের প্রধান রক্ষক অ্যালেন হ্যাভেসির বিরুদ্ধেও এ রকম অভিযোগ এসেছিল। তিনি তার ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। অপরাধ শাস্তিযোগ্য হওয়ায় তাকেও শাস্তি পেতে হচ্ছে। এই যে ঘটনাবলি তা শুনে কেউ কেউ হয়তো বলবেন, যুক্তরাষ্ট্রে তো দুর্নীতি আরো অনেক হচ্ছে। সব দুর্নীতির বিচার হচ্ছে কি? বিচার যে হচ্ছে না তা কিন্তু নয়। দু’চারজন রাঘববোয়ালকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর মাধ্যমে যু্ক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ এই বিশ্বাস স্থাপনে সমর্থ হয়েছে যে, মানুষের আস্থা নিয়েই চলেছে স্বাধীন বিচার বিভাগ। বাংলাদেশেও সদ্য স্বাধীন বিচার বিভাগ যাত্রা শুরু করেছে। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এই যাত্রা শুরুকে স্বাগত জানাতেই হবে। প্রশ্ন আসতেই পারে, এরপর মানুষ সুবিচার কিংবা দ্রুত বিচার পাবে কি-না। কিংবা মানুষের পক্ষে ন্যায়বিচার সুপ্রতিষ্ঠিত হবে কি-না। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সঙ্গে গ্র্যান্ড জুরিদের মতামতের প্রতিফলন ঘটানোটাও জরুরি বলে আমি মনে করি। উন্নত গণতান্ত্রিক বিশ্বে জুরি ব্যবস্তা ক্রমশ প্রাধান্য পাচ্ছে। এতে নাগরিক দায়িত্ব যেমন প্রতিষ্ঠিত হয় তেমনি হয় ভারসাম্য রক্ষা করে সুবিচার প্রতিষ্ঠা। এ প্রসঙ্গে আরেকটি কথা না বললেই নয়। তা হচ্ছে, বাংলাদেশে জমি-জিরাত সম্পর্কিত দেওয়ানি মামলাগুলোর কথা। আমরা দেখেছি, বাংলাদেশে এসব দেওয়ানি মামলা যুগের পর যুগ আদালতে চলতেই থাকে। একটি মামলাকে ‘দাদা-বাপ-পুত্র’ এ রকম তিন পুরুষও চালিয়ে গেছেন কিন্তু মামলার সুরাহা হয়নি এমন নজিরও আমরা দেখেছি। বাংলাদেশের আইনে ফৌজদারি মামলা যতটা গুরুত্ব পায়, দেওয়ানি মামলাগুলো এর চেয়ে কম গুরুত্ব পেয়ে থাকে। এ অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন প্রয়োজন। কারণ, যিনি বিচারপ্রার্থী তিনি সমস্যাটির সমাধান এবং দ্র“ত সুবিচার পাওয়ার জন্যই আইনের আশ্রয় নেন। এক্ষেত্রে তা ঝুলে থাকবে কেন? কেন কালক্ষেপণ একজন নাগরিককে রাখবে মানসিক অশান্তিতে।যুক্তরাষ্ট্রের প্রেক্ষাপটে বলা যায়, এখানে জমিজমা, রিয়েল এস্টেট সম্পর্কিত মামলাগুলো সিভিল ল’র অধীনে গুরুত্বের সঙ্গেই বিবেচিত হয়। বরং অবৈধভাবে দখলদার কেউ ত্রিক্রমিনাল অ্যাক্টে দোষী সাব্যস্ত হতে পারে। ওয়ান-ইলেভেনের পর আমরা ইদানীং একটি কথা প্রায়ই শুনি। তা হচ্ছে সবাই-ই যদি দোষী হয়ে গেল তবে বাংলাদেশে নীতিবান রাজনীতিক ও ব্যবসায়ী কারা? আমার মনে হয়, এ প্রশু যারা তোলেন তারা শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে চান। তাহলে কি আমরা ধরে নেব ১৪ কোটি মানু্ষের রাষ্ট্রে কোনো নীতিবান নেই? অবশ্যই আছেন। আর আছেন বলেই এই প্রজন্ম সোনালি সূর্যের স্বপ্ন দেখে। এখনো মানুষ প্রত্যয় নিয়ে বলে, মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অহংকার। অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় মানুষ। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, দুর্নীতিতে বাংলাদেশ বারবার চ্যা¤িক্সয়ন হওয়ার পরও দেশের শাসকশ্রেণী বিষয়টিকে মোটেও গুরুত্ব দেয়নি। দখলের মাত্রা এত চরমে পৌঁছেছিল, এক সময় এই রাষ্ট্রটিকেই কেউ কেউ নিজেদের নামে লিখিয়ে নেয় কি-না তা নিয়ে শংকা দেখা দিয়েছিল। রাস্তা বন্ধ করে যারা ক্রিকেট খেলে উল্লাস নৃত্য করেছিল, কিংবা যারা ট্রাক তুলে দিয়েছিল গণমানুষের ওপর এরা কোন শ্রেণীর মানসিকতা পোষণ করতো তা দিনে দিনে অনেক খোলসা হয়েছে। জরুরি কথা একটাই, রাষ্ট্রে যদি সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হয় তবেই দুর্নীতি সিংহভাগ কমে যেতে বাধ্য। আর তা হতে হবে যে কোনো রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে। পৃথিবীর দেশে দেশে জুলুমকারী জালেমরা আছে। কিন্তু বিশ্বের আপামর মানুষই শান্তিকামী। অধিকাংশ মানুষই দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার। তা প্রমাণিত হয়েছে, এখনো হচ্ছে দেশে দেশে, যুগে যুগে।-------------------------------------------------------------------------------দৈনিক সমকাল। ঢাকা। ৪ মার্চ ২০০৮ মংগলবার প্রকাশিত